মা ছাড়া নবজাত বিড়ালছানা পালার সঠিক পদ্ধতি
রাস্তায় প্রায়ই বিড়ালছানা দেখা যায়। দেখলেই আগে নিয়ে আসবেন না, আগে নিশ্চত হন ওর আসলেই মা আছে কিনা আসে পাশে, দূর থেকে দারিয়ে খেয়াল করুন, বেশি কাছে থাকলে আপনাকে দেখে মা বিড়াল আসতে ভয় পাবে। মা বিড়ালরা বাচ্চাদের রেখে চলে যায় আবার ঘণ্টা খানেক পর ফিরে আসে,তাই সময় নিয়ে দেখুন। যদি নিশ্চত হন যে ওর মা নেই বা কেউ ফেলে দিয়েছে ওকে তাহলে ওকে নিয়ে আসবেন।
দুই সপ্তাহ বয়সের আগে বিড়ালছানারা নিজের শরীরের তাপমাত্রা নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না,ওরা কাঁপতে পারেনা,তাই বিড়ালছানাকে সবসময় উষ্ণ রাখবেন। যদি কোন বিড়ালছানা ঠান্ডা থাকে তাকে ধিরে ধিরে সাভাবিক তাপমাত্রায় আনতে হবে।
সব থেকে ভালো এবং নিরাপদ উপায় হল বিড়ালকে উষ্ণ করতে আপনার বুকের উপর রাখবেন, হাত দিয়ে পুরো শরীর ধিরে ধিরে আদর করে মালিশ করবেন। এতে ও আপনার তাপমাত্রা পাবে এবং ধিরে ধিরে উষ্ণ হবে। ওদের কাছে হৃদস্পন্দন (heartbeat) এর শব্দ অনেক সান্তনাদায়ক ( soothing)। বিড়াল ছানাকে ধিরে ধিরে উষ্ণ করবেন, বেশি তাড়াতাড়ি উষ্ণ হয়ে যায় এমন কোন পদ্ধতিতে উষ্ণ করতে গেলে বিড়ালছানা মারা যেতে পারে। ঠান্ডা বিড়ালছানাকে কখনোই খাওয়াবেন না! আগে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনে এনে তারপরই একমাত্র খাওয়াবেন। এই সময় ওকে উষ্ণ গ্লুকোজ পানি দিতে পারেন অল্প বা মধু ওর জিভে মাড়িতে লাগিয়ে দিতে পারেন।
হিটার থাকলে হিটার ছেড়ে দিতে পারেন, অথবা হিট লাম্প একদম low তে দিয়ে (৩-৪ ফিট দূরে রাখবেন এটি) তবে বিড়ালছানার তাপমাত্রা যেন ঠিক থাকে, ভুলেও যেন তাপমাত্রা বেশি হয়ে বেশি গরম (overheated) না হয়ে যায় এটা অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। বোতলে গরম পানি ভরে রাখা যায় (সরাসরি গরম পানির বোতল কাছে রাখবেন না কখনো, ভালো করে টাওয়াল দিয়ে পেঁচিয়ে নেবেন,সরাসরি বেশি তাপে বিড়ালছানা পুড়ে যাবে। বাতলের মুখ ঠিক মত লাগানো কিনা খেয়াল করবেন,পানি যেন বের না হয়ে যায়, পানি গরম থাকলে বিড়ালছানা পুড়ে যেতে পারে গায়ে লেগে। গরম পানির বোতল ব্যবহার করলে খেয়াল রাখতে হবে যেন পানি ঠান্ডা না হয়ে যায়, তাহলে উল্টা বিড়ালছানার শরীর থেকে উষ্ণতা শোষিত হবে। তাই এই পদ্ধতিগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
যদি বিড়ালছানার তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে সেই ক্ষেত্রে ধিরে ধিরে তাপমাত্রা সাভাবিকে আনতে হবে। বাতাস যুক্ত জায়গায় রাখুন তাপমাত্রা সাভাবিক করার জন্য।
বিড়ালছানাকে কোথায় রাখব?
আপনার বুকের উপর যদি রাখতে পারেন অধিকাংশ সময় এটা সবথেকে ভালো । ওর থাকার জন্য একটি বক্স বা ঝুড়ি দেবেন, ও নড়াচড়া করার জন্য যেন যথেষ্ট জায়গা থাকে, তবে অনেক বেশি বড়ও যেন না হয়। বক্স বা ঝুড়ির উচ্চতা এমন হতে হবে যেন বিড়ালছানা বের হয়ে না যেতে পারে। প্রথমে কাগজ দেবেন তার উপর নরম কাপড় দেবেন। উলের কিছু কখনো দেবেন না। ঘুমানোর জায়গাটি দিনে একবার কম করে অবশ্যই পুরোপুরি বদলাবেন, কয়েকবার বদলালে আরও ভালো। ময়লা কাপড় সাবান দিয়ে ধুয়ে দেবেন। বিড়ালছানাকে ধরার আগে জীবাণুনাশক সাবান দিয়ে আপনার হাত ধুয়ে নেবেন। যেহেতু মা ছাড়া বিড়ালছানা তাই পরিচ্ছনতার ব্যাপারে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।
খাবার : KMR (Kitten Milk Replacer) কিনবেন । এটা সদ্যজাত মা ছাড়া বিড়াছানাদের (orphan kitten) দের জন্য তৈরি । এটি পাউডার ও লিকুইড দুই রূপেই পাওয়া যায় । পাউডার হলে এর গায়ে লেখা অনুযায়ী তৈরি করবেন । অনলাইন শপ গুলোতে পাবেন বা গুলশান ২ ডিসিসি মার্কেটের দ্বিতীয় তলার প্রথম দোকানে পাবেন। কোন ভাবেই যদি KMR না পান খুজে, তাহলে ছাগলের দুধ খাওয়াতে পারেন। KMR বা ছাগলের দুধ কোনটাই না পেলে গরুর দুধের (ডানো বা লাকটোজেন ফর্মুলা etc) সাথে পর্যাপ্ত পানি মিশিয়ে (দুধ : পানি = ১ : ২/৩ অনুপাতে মিশাবেন) খাওাবেন । অর্থাৎ পানি যদি একভাগ নেন তাহলে পানি তার দুইগুন বা তিনগুন বেশি নেবেন। একবার তৈরি করে ২ ঘণ্টার বেশি রাখবেন না ।
গরুর দুধে অনেক বিড়াল ছানাদের পেট খারাপ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে গরুর দুধ দেবেন না কখনো ভুলেও। মুরগির সুপ (chicken stew) করে খাওয়াতে পারেন এক্ষেত্রে । (বাসায় তৈরি, কোন মসলা থাকবে না)
বেশি খাওয়ানোর (overfeeding) ফলেও পেট খারাপ হতে পারে। তাই খেয়াল রাখবেন যেন অনেক বেশি খাওয়িয়ে না ফেলেন।
কতক্ষন পর পর খাওয়াবো?
জন্মের প্রথম এক সপ্তাহ প্রতি ২ ঘণ্টা পর পর
২-৪ সপ্তাহ বয়স : প্রতি ৩ ঘণ্টা পর পর, একবারে যদি বেশি না খায়, তাহলে ব্রেক দিয়ে খাওয়াবেন, তবে অনেক বেশি খাওয়িয়ে ফেলবেন না, বেশি খেয়ে ফেললে পেট খারাপ হতে পারে।
৪-৫ সপ্তাহ বয়স : প্রতি ৬-১২ ঘন্টা পর, কতটা সলিড খাবার খাচ্ছে তার উপর নির্ভর করে দুধ কত কম বেশি খাবে। সলিড খাবার কম খেলে দুধ বেশি খাবে, সলিড খাবার বেশি খেলে দুধ কম দেবেন, তবে সলিড খাবার আস্তে আস্তে বাড়াতে হবে।
কতটুকু খাওয়াবো?
০-১ সপ্তাহ বয়সে ২৪ cc/ml ফর্মুলা খাবে একদিনে।
১ সপ্তাহ বয়সে ৩২ cc/ml ফর্মুলা খাবে একদিনে।২ সপ্তাহ বয়সে বিড়াল ৫৪-৫৫ cc/ml ফর্মুলা খাবে একদিনে।
৩ সপ্তাহ বয়সে ৮০ cc/ml ফর্মুলা খাবে একদিনে।৪ সপ্তাহ বয়সে ১০০ -১০৪ cc/ml ফর্মুলা খাবে একদিনে।
৫ সপ্তাহে ১২৫ -১২৮ cc/ml ফর্মুলা খাবে একদিনে।
এটা একটা অনুমান মাত্র।
কিসে করে খাওয়াবো?
বিড়ালছানাদের খাওয়ানোর জন্য আলাদা একদম ছোট ফিডার পাওয়া যায় ,এটি কিনে নেবেন। ছোট ড্রপার দিয়েও খাওয়াতে পারেন।
ফিডার বা ড্রপার কতবার পরিষ্কার করব?
প্রতিবার খাওয়ানোর পর ফিডার বা ড্রপার অবশ্যই গরম পানিতে ৫ মিনিট ফুঁটিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নেবেন। বিড়ালছানাকে ধরার আগে আপনার নিজের হাত নখ ও ভালো করে জীবাণুনাষক সাবান দিয়ে ধুয়ে নেবেন। যেহেতু মা ছাড়া বিড়ালছানা তাই পরিচ্ছনতার ব্যাপারে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।
খাওয়ানোর সঠিক পদ্ধতি কি?
বিড়ালের বাচ্চাকে কখনো ভুলেও চিত করে মানুষের বাচ্চার মত খাওয়াবেন না, এতে ট্রাকিয়া তে খাবার চলে যেতে পারে । মাথা শরীর যেন সোজা থাকে ,নিচের ছবিটার মত ধরে খাওয়াবেন।
বিড়ালছানাকে সময় নিয়ে ফর্মুলা খাওয়াবেন। একবারে অনেকগুলা মুখে ভরে দেবেন না, নাকে মুখে চলে যেতে পারে, ফুশফুশে চলে যেতে পারে ফলে মারা যেতে পারে। ওকে চুষে খেতে দিন,সময় নিয়ে খাওয়ান।
খাওয়ানোর পর ঢেকুর তুলাতে হবে। বিড়ালছানাকে আপনার কাধে /সামনে রেখে ওর পিঠে হাল্কা করে tap করুন, এভাবে করলে বায়ু বের হয়ে
ঢেকুর তুলার নিয়ম
পস্রাব পায়খানা : প্রতিবার খাওয়ানোর পর পস্রাব পায়খানা করিয়ে দেবেন অবশ্যই । এত ছোট বিড়ালের বাচ্চা এই বয়সে নিজে নিজে পস্রাব পায়খানা করতে পারে না। মা বিড়াল চেটে চেটে করিয়ে দেয় । আপনার যেটা করতে হবে সেটা হল , পস্রাব করানোর জন্য , তুলা হালকা উষ্ণ পানিতে ভিজিয়ে ,পস্রাব করার জায়গায় হালকা করে ডলতে থাকবেন, অল্প ধরলেই পস্রাব করে দেবে। পায়খানা করানোর জন্য একই ভাবে , তুলা হালকা উষ্ণ পানিতে ভিজিয়ে ,পায়খানা করার জায়গায় ডলতে থাকবেন, তবে খেয়াল রাখবেন যাতে ব্যাথা না পায় বা লাল না হয়ে যায়, আস্তে (gently)
পস্রাব করিয়ে দেওয়ার নিয়ম
বিড়ালের যদি পায়খানা না হয় বা কোষ্টকাঠিন্য হয় সেই ক্ষেত্রে একফোঁটা অলিভ অয়েল খায়িয়ে দেখতে পারেন। তবে যদি দেখেন বিড়াল ছানা কোনভাবেই পায়খানা করছে না ,অথবা পেট খারাপ হয়েছে তাহলে অবশ্যই অবশ্যই পশু চিকিৎসক এর কাছে নিয়ে যাবেন সাথে সাথে ।
বিড়ালের পানিশূন্যতা আছে কিনা তা বোঝার জন্য ওর চামড়া আস্তে করে টান দিন, পানিশূন্যতা না থাকলে চামড়া সাথে সাথে নিচ নেমে যাবে, কিন্তু পানিশূন্যতা থাকলে ধিরে ধিরে নামবে। এই ক্ষেত্রে গ্লুকোজ খাওয়ান এবং পশু চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন সাথে সাথে।
বিড়ালছানা যদি না খায় পশু চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।
সবথেকে জরুরি কথা হল, বিড়ালছানাকে অনেক আদর করবেন, হাল্কা গলায় কথা বলবেন, উৎসাহ দেবেন, প্রসংশা করবেন । মা বিড়াল তার ছানাকে চাটে, আদর করে, পাশে শুয়ে থাকে সারাদিন। শুধুমাত্র খাওয়িয়ে, ঢেকুর তুলিয়ে, পস্রাব পায়খানা করিয়ে ঝুড়িতে রেখে দিলে সেটি হয় না। যেটা আগেও লিখেছি চেষ্টা করবেন অধিকাংশ সময় আপনার বুকে রাখতে, ঠিক মায়ের মতই ভালবাসা দেবেন। ছোট বিড়ালছানাদের জন্য এটি অনেক অনেক বেশি জরুরি। বিড়ালছানার আপনার সংস্পর্শের,ভালবাসার আদরের অনেক বেশি দরকার।
বিড়ালছানার বয়স ৫ সপ্তাহ হলে ধীরে ধীরে সলিড খাবার খাওয়াতে শিখাবেন , ২ মাস বয়স হলে বিড়াল পুরোপুরি সলিড খাবার খাবে অন্য কিছু না। সেদ্ধ মুরগি, মুরগির stew/সুপ , সেদ্ধ ডিম, সেদ্ধ মাছ (রুই, কাতল, ইলিশ,যে কোনো মাছ খাওয়াতে পারেন, একই মাছ এক টানা অনেকদিন খাওয়াবেন না, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একেক সময় একেক মাছ দেবেন।তবে শুটকি কখনই দেবেন না, টুনা মাছ প্রতিদিন দেবেন না কখনো) এগুলো খাওয়াবেন। কোন ধরনের তেল ,মশলা, চিনি, পেঁয়াজ , রসুন দেওয়া কোন খাবার কখনই খাওয়াবেন না, এগুল সাস্থের জন্য ভাল না। শুধু পানিতে সেদ্ধ করে খেতে দেবেন, হালকা হলুদ দিতে পারেন চাইলে, আর একদমই অল্প লবণ, না দেয়ার মত,আর কিচ্ছু না। যদি ভাত খাওয়াতে চান তাহলে অল্প ভাতের সাথে বেশি বেশি মাংস মাছ মাখিয়ে খেতে দেবেন। বিড়াল মাংসাশি প্রানি তাই মাংসই ওদের খাবার। commercial cat food খেতে দেবেন না বিড়ালকে, এটি সাস্থের জন্য অনেক খারাপ। কিডনিতে পাথর, কিডনির অন্য সমস্যা, মুত্রনালিতে পাথর হয়, ডায়াবেটিস, ওবেসিটি আরও অনেক রোগ হয়।
বিড়ালছানার বয়স ৩-৪ সপ্তাহ হলে পটি ট্রেনিং শুরু করবেন।
বিড়াল ছানার বয়স ৩ মাস হয়ে গেলে অবশ্যই টিকা দেবেন, ৪ মাস এর বেশি দেরী করবেন না একদমই।
ভিজিট করুন- PetVet
BD
